বাংলার প্রতিচ্ছবি: লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হুমকি ও সামুদ্রিক অবরোধ মোকাবিলায় সৌদি আরবের উদ্যোগে গঠিত ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালাইন্স’-এ যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। গত ৩১ জুলাই রিয়াদে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের যৌথ স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই প্রতিরক্ষা জোটের যাত্রা শুরু হয়। এতে করে প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশ কি তবে ইরানের বিপক্ষে অবস্থান নিল, নাকি ‘কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতি থেকে সরে এল? বিশ্লেষকরা বলছেন, জোট নিরপেক্ষতার নীতিতে টান পড়লেও বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমবাজার রক্ষার মতো ‘জাতীয় স্বার্থে’ ঢাকার সামনে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া বিকল্প কমই ছিল।
কেন গঠিত হলো এই সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট?
ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লোহিত সাগর ও ‘বাব আল-মান্দাব’ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব বহুলাংশে বেড়ে যায়। বিশ্ব বাণিজ্যের ১০-১২ শতাংশ ও বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। তবে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী লোহিত সাগরে অবরুদ্ধ পরিস্থিতি ও সৌদিসংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালানোয় পথটি অনিরাপদ হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুট সুরক্ষিত রাখতে এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের লক্ষ্যে সৌদি আরবে এই স্থায়ী সামরিক জোট ও যৌথ অভিযান কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জোটে যোগ দেওয়ার মূল কারণ
১. জাতীয় অর্থনৈতিক ও জ্বালানি স্বার্থ: লোহিত সাগর বন্ধ হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানি চরম ধাক্কা খাবে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় একটি অংশ এই পথেই পরিচালিত হয়।
২. সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক: রিয়াদে বিশাল শ্রমবাজার রক্ষা এবং কূটনৈতিক-কৌশলগত দূরত্ব কমানো।
৩. যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের সমীকরণ: সৌদির এই উদ্যোগের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন স্পষ্ট। পশ্চিমা ও সৌদি অক্ষের আহ্বানে সাড়া না দিলে শ্রমবাজার ও বাণিজ্যিক সম্পর্কে প্রভাব পড়ার আশঙ্কার কথাও বলছেন বিশ্লেষকরা।
“লোহিত সাগরে জাতিসংঘের বাইরে সরাসরি সেনা বা নৌবহর মোতায়েন না করা পর্যন্ত বাংলাদেশে সামরিক ভূমিকা থাকবে ‘প্রতীকী’। তবে সমুদ্রপথ খোলা রাখা আমাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গেই সরাসরি জড়িত।”
— হুমায়ুন কবির, প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ও সভাপতি, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট
পররাষ্ট্রনীতি, অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য ঝুঁকি
| পর্যবেক্ষকের ধরণ | মতামত ও আশঙ্কা |
| সরকার ও কূটনীতিবিদরা | সরকার এটিকে কেবল ‘নৌপথের নিরাপত্তা ও শান্তির স্বার্থে নীতিগত সমর্থন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গেও কথা বলা হচ্ছে এবং বাংলাদেশের সক্ষমতা অনুযায়ী কেবল সহায়তার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। |
| বাম ও বিরোধী মোর্চা (গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট) | সিদ্ধান্তটির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়েছে, মার্কিন-সৌদি এই জোটে যোগদান ইরান ও ফিলিস্তিনের ওপর সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণের অংশ এবং এটি মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করবে। |
| নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা | নিরাপত্তা বিশ্লেষক নাসির উদ্দিন আহমেদের মতে, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান সাবমেরিন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা চীন থেকে আসা। চীন ও ইরান এই পদক্ষেপকে কীভাবে দেখছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যদি সামরিকভাবে সেখানে দৃশ্যমান ভূমিকা নেয়, তবে বাংলাদেশি জাহাজ হুতি বা অন্য গোষ্ঠীর সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। |
বিশ্লেষকদের পরামর্শ—এই পদক্ষেপে যদি সৌদি আরবের কাছ থেকে সরাসরি বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সংকটে পাশে পাওয়ার কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি আদায় করা যায়, তবেই কেবল এই সামরিক জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগতভাবে অর্থবহ হবে।