ঢাকা | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং | বঙ্গাব্দ

তারেক রহমানের সরকার, ইউনূসের দুই বছর ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে পিনাক রঞ্জন

প্রকাশের তারিখ: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬ ইং

ছবির ক্যাপশন:
ad728

বাংলার প্রতিচ্ছবি: দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক সব সময়ই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতার রদবদল, আঞ্চলিক নিরাপত্তাশঙ্কা এবং দুই প্রতিবেশী দেশের কোটি কোটি মানুষের আর্থসামাজিক স্বার্থকে ঘিরে এই সম্পর্ক এখন এক নতুন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এই কঠিন কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঢাকার সাবেক ভারতীয় কূটনীতিকের মূল্যায়ন তুলে ধরছে দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা ও আগামী দিনের নানা চ্যালেন্জ।

বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এবং ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কূটনৈতিক সম্পাদক শুভজিৎ রায়কে এক বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারের সম্পাদিত অংশ নিচে তুলে ধরা হলো।

সাক্ষাৎকারে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন বিএনপি সরকারের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দুই দেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর থেকেই দেশটির রাজনীতিতে অস্থিরতার ইতিহাস রয়েছে।

মুহাম্মদ ইউনূসের মেয়াদের দুই বছরকে ‘বিপর্যয়কর’ আখ্যা দিয়ে সাবেক এই হাইকমিশনার বলেন, ওই সময়ে অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। ছাত্র আন্দোলন দখল করে নেওয়া জামায়াতে ইসলামীর কথামতো তিনি চলছিলেন। তা ছাড়া আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে না দেওয়ায় সেই নির্বাচনও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় বিএনপি সরকার প্রচুর চাপের মধ্যে রয়েছে। এ ছাড়া দেশে বিদ্যুৎ, রান্নার গ্যাস ও জ্বালানিরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, এ নিয়ে ঢাকায় তীব্র আলোচনা চলছে। তাঁর ধারণা, ভারতবিরোধী লবি জয়ী হওয়ায় তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে ভারত সফর করা থেকে বিরত থেকেছেন। তবে অভিন্ন সভ্যতার অংশীদার হওয়ায় বাংলাদেশ চাইলেই ভারতকে পাশ কাটাতে পারবে না কিংবা অন্য কোনো দেশ দিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব নয়। লাখ লাখ বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য ভারতে যায় এবং দুই দেশের মধ্যে বিশাল বাণিজ্য ও যোগাযোগ রয়েছে।

ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে পিনাক রঞ্জন বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষেত্রে ভারতের নীতি স্পষ্ট—ক্ষমতায় যে সরকারই থাকুক না কেন, তাদের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখা। সামরিক শাসন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা নির্বাচিত সরকার—সবার সঙ্গেই ভারত কাজ করেছে। মানুষে-মানুষে যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষার মতো স্বাভাবিক সম্পর্কগুলো ভারত কখনোই বন্ধ করবে না।

শেখ হাসিনাকে কেন ভারত আশ্রয়ে রেখেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, হাসিনার সরকারের সঙ্গে ভারতের ভালো সম্পর্ক ছিল এবং তাকে ভারতে আশ্রয় না দেওয়ার কোনো কারণ ছিল না। এমনকি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও বলেছেন যে দিল্লিতে হাসিনার অবস্থান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব ফেলা উচিত নয়। তবে কিছু গোষ্ঠী তাকে ভারতের কাছে হস্তান্তরের দাবি তুলছে। বাংলাদেশ কয়েকটি অনুরোধ জানালেও প্রত্যর্পণ মূলত একটি বিচারিক প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশ সরকার এখনও তা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেনি। হাসিনা নিজে ফিরে যেতে চাইলে ভারত বাধা দেবে না, তবে দেশে ফিরলে তার নিরাপত্তা নিয়ে ভারত উদ্বেগে থাকবে, কারণ জামায়াতের মতো উগ্র গোষ্ঠীগুলো তাকে আক্রমণ করতে পারে।

হাসিনার বক্তব্য তারেক রহমানের সফরকে বাধাগ্রস্ত করেছে কি না, সে বিষয়ে এই জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে কাউকে কি কথা বলা থেকে আটকে রাখা যায়? তাকে তো কোনো বন্দিশালায় রাখা হয়নি, তিনি নিজ ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন।’

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরায় জোরদার করা সম্ভব কি না—প্রশ্নের জবাবে পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘এটি অবশ্যই সম্ভব, তবে তালি দুই হাতে বাজে। ভারত যথেষ্ট সদিচ্ছা দেখিয়েছে, এখন বল ঢাকার কোর্টে।’ বর্তমানে বাংলাদেশের মূল সমস্যা অর্থনীতি, আর সাধ্যমতো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ দিয়ে ভারতকে তা সহায়তার চেষ্টা করতে হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

নিরাপত্তা ও কৌশলগত দিক নিয়ে তিনি বলেন, বড় সংখ্যক চরমপন্থী ও উগ্রবাদীদের মুক্তি এবং তাদের পুনর্গঠিত হওয়াটা চরম উদ্বেগের বিষয়। জাতিসংঘও বাংলাদেশে আল-কায়েদার পুনরুত্থানের বিষয়ে রিপোর্ট দিয়েছে। বাংলাদেশে উগ্রবাদের পুনরুত্থান ঘটলে তা ভারতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং পাকিস্তান সেই সুযোগ নেবে।

নদী চুক্তির বিষয়ে সাবেক এই হাইকমিশনার জানান, দুই দেশের ৫৪টি নদীর মধ্যে মাত্র গঙ্গা চুক্তি রয়েছে, যা আগামী ডিসেম্বরে মেয়াদোত্তীর্ণ হতে চলেছে। তিস্তা চুক্তি না হলেও মূল তাৎক্ষণিক বিষয় হলো গঙ্গা পানি চুক্তি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির লভ্যতা কমায় সেখানে দরকষাকষি কঠিন হবে।

চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তান প্রসঙ্গে পিনাক রঞ্জন বলেন, বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের প্রায় ৮০ শতাংশ চীন থেকে আসে এবং তারা বিআরআই ও বঙ্গোপসাগরীয় করিডোরের মাধ্যমে কৌশলগত অবস্থান নিতে চায়, যা যুক্তরাষ্ট্র চায় না। অন্যদিকে পাকিস্তানের মূল লক্ষ্য ভারতবিরোধী অবস্থান তৈরি করা, তবে বাংলাদেশ সেই ফাঁদে পা দেবে না বলেই তিনি বিশ্বাস করেন।

(সাক্ষাৎকারের মূল সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)

কমেন্ট বক্স