বাংলার প্রতিচ্ছবি: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এখন আলোচনার কেন্দ্রে সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন। সংবিধান অনুযায়ী ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনে শিগগিরই তপশিল ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দলীয় সূত্র বলছে, আসন বণ্টনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিএনপির ভাগে ৩৫-৩৬টি আসন পড়তে পারে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, রমজানের মধ্যেই সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। ঈদের আগেই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে চায়। এটা ৯০ দিনের মধ্যেই করতে হয়। সে ক্ষেত্রে যদি সম্ভব হয়, রোজার মধ্যেই এটা করে ফেলার চেষ্টা করা হবে।
এদিকে, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পেতে এরই মধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেত্রীরা। যাদের বেশিরভাগই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের কয়েকজন নেতা বলেছেন, ইসির তপশিল অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। বিএনপিতে যোগ্য নারী নেত্রীর সংখ্যা অনেক। তাদের রাজনৈতিক ত্যাগ, অভিজ্ঞতা ও অবদান বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এবার তরুণ নেত্রীদের মূল্যায়নের সম্ভাবনাও রয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির যারা এগিয়ে, কী বলছেন বিশ্লেষকরা:
নির্বাচন কমিশন ৫০টি ধরেই সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন করার উদ্যোগ নিচ্ছে। এতে কোনো সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে কি না, জানতে চাইলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সদস্য ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার কালবেলাকে বলেন, এখন ৫০টি আসন আছে। নির্বাচন করতে কোনো বাধা নেই। পরবর্তী সময়ে যদি দলগুলো একমত হয় বা সংসদে যদি পাসও হয়, সেক্ষেত্রে বাকি ৫০টি পরবর্তী সময়ে করে ফেলবে।
সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী বলেন, ১০০ আসন তো এখনো করেনি। এটি না হওয়া পর্যন্ত আগের আইন পূর্ণ বহাল থাকে। তার মানে এটাকে স্থগিত করা বা অন্য কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। এটি সংসদে পাস হলে তা সংবিধানে যুক্ত হবে। তারপর আইন সংশোধন হবে। আইন সংশোধন হলে সেখানে বলা থাকবে যে, কবে থেকে আইনটি কার্যকর হবে। যেহেতু এখনো তা হয়নি, না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান সংবিধান বহাল আছে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী ৩০০ আসনে নির্বাচন হলো। যেটা কথা ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ হবে। তাতে তো মেজর যে পক্ষ সে পক্ষ শপথ নেয়নি। তাই ওটার কার্যক্রমও মূলত চালু হয়নি। তাহলে তো আগেরটাই বহাল থাকবে।
এ বিষয়ে ইসির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব ও বিএনপির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ড. মোহাম্মদ জকরিয়া কালবেলাকে বলেন, এখন আইন যা আছে তাই তো হবে। জুলাই সনদ তো কোনো সংবিধান না উল্লেখ করে তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সংসদ অনুমোদন না দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত এগুলোর আইনি কোনো ভিত্তি নেই। যদি আইনগুলো সংসদে প্রথম অধিবেশনে পাস না হয়। তাহলে তো ওগুলোর ন্যাচারাল ডেথ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, সংরক্ষিত আসনের ৫০টি আসন তো এক দিনে হয়নি। এটি যখনই বাড়বে তখন হবে, অসুবিধা নেই। এখন বিদ্যমান যেটি আছে সেটিই হবে।
বিএনপি কি এটি বাস্তবায়ন করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তো পলিসি ডিসিশন। অনেক আলাপ আলোচনার বিষয়। এটি এখনো ডিসাইডেড কোনো বিষয় না। ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী দেওয়ার কথা ছিল। কোনো দলই তো তা বাস্তবায়ন করেনি। কোনো কোনো দল তো একটি আসনেও নারী প্রার্থী দেয়নি বলে জানান তিনি।
আলোচনায় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রীরা:
জানা গেছে, এবার সংরক্ষিত নারী আসনে মহিলা দলের ত্যাগী নেত্রী ও অপেক্ষাকৃত তরুণদের জায়গা দেওয়ার চিন্তা করছে বিএনপির হাইকমান্ড। তাদের সঙ্গে কয়েকজন প্রবীণ নেত্রীও জায়গা পাবেন। কেননা, ২০০১ সালে যারা সংক্ষিপ্ত আসনের এমপি ছিলেন তাদের অনেকে বয়সের কারণে রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছেন। কেউ কেউ এখনো রাজনীতির মাঠে আছেন। তাদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ এবারও জায়গা করে নিতে পারেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনগুলোয় মনোনয়নের জন্য আগ্রহী বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের শতাধিক নেত্রী, যাদের অনেকেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত এবং মনোনয়ন পেয়েও পরাজিত হওয়া প্রার্থী। তরুণ প্রজন্মের নেত্রীরা বিশেষ করে বিগত ১৭ বছরে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন, হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন এবং কারাবরণ করেছেন, তাদের নামও আলোচনায় আছে। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ঢাকায় অবস্থান করে দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন, বিভিন্ন পর্যায়ে তদবিরও করছেন। তবে মনোনয়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলের হাইকমান্ড নেবে বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য আলোচনায় আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সেলিমা রহমান। তিনি ২০০১ সালে সংরক্ষিত আসনে এমপি এবং মন্ত্রী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী ও নির্বাচিত সিনেট সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানাও আছেন আলোচনায়। আরও আলোচনায় আছেন ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী ও মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারের স্ত্রী ডা. সৈয়দা তাজনিন ওয়ারিস সিমকী, যিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের (জেডআরএফ) পরিচালক।
সাবেক এমপিদের মধ্যে ফেনী থেকে রেহানা আক্তার রানু, জামালপুর থেকে নিলোফার চৌধুরী মনি, মাগুরা থেকে নেওয়াজ হালিমা আর্লি, মাদারীপুর থেকে হেলেন জেরিন খান, ঢাকা থেকে সুলতানা আহাম্মেদ, চাঁদপুর থেকে রাশেদা বেগম হীরা, হবিগঞ্জ থেকে শাম্মী আক্তার, বরিশাল থেকে বিলকিস জাহান শিরিন, সিরাজগঞ্জ থেকে বরেণ্য সংগীতশিল্পী কনক চাঁপা ও নীলফামারী থেকে বেবী নাজনীন আলোচনায় আছেন।
এ ছাড়া আলোচনায় আছেন ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী ও গৌরীপুর উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান তানজিন চৌধুরী লিলি, যিনি ময়মনসিংহ উত্তর জেলা মহিলা দলের সভাপতি। এ অঞ্চল থেকে আরও আলোচনায় আছেন ফুলবাড়িয়া উপজেলা মহিলা দলের সভাপতি এবং ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা মহিলা দলের সহসভাপতি ফাহসিনা হক লিরা, যিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি।
এ ছাড়া পাবনা থেকে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, বরগুনা থেকে মহিলা দলের কেন্দ্রীয় স্বনির্ভরবিষয়ক সহ-সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ, রাজশাহী থেকে বিএনপি নেত্রী মাহমুদা হাবিবা ও রাজশাহী জেলা মহিলা দলের সভাপতি শামসাদ বেগম মিতালী, ঢাকা থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পুত্রবধূ ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সদস্য ও খিলগাঁও মডেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রোকেয়া চৌধুরী বেবি, গোপালগঞ্জ-১ আসনে নির্বাচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিমের স্ত্রী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী সাবরিনা বিনতে আহমেদ, ফেনী থেকে অ্যাডভোকেট শাহানা আক্তার শানু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ মহিলা দলের নেত্রী নাদিয়া পাঠান পাপন, নরসিংদী থেকে ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী সেলিনা সুলতানা নিশিতা, মাদারীপুর থেকে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেত্রী অ্যাডভোকেট শওকত আরা উর্মি, মুন্সীগঞ্জ থেকে নাসিমা আক্তার কেয়া, মানিকগঞ্জ থেকে মনিরা আক্তার রিক্তা, বরিশাল থেকে আফরোজা খানম নাসরিন, লক্ষ্মীপুর থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মরহুম শফিউল বারী বাবুর সহধর্মিণী বিথিকা বিনতে হুসেইন, মানিকগঞ্জ থেকে রুকসানা খানম মিতু, বাগেরহাট থেকে আয়শা সিদ্দিকা মানি, কুমিল্লা থেকে হেনা আলাউদ্দিন, কুষ্টিয়া থেকে ফরিদা ইয়াসমিন, নারায়ণগঞ্জ থেকে অ্যাডভোকেট সালমা আক্তার সোমা, নরসিংদী থেকে মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস ও নিলুফা ইয়াসমিন নিলু, নোয়াখালী থেকে অ্যাডভোকেট শাহিনুর বেগম সাগর, বান্দরবান থেকে আলীকদম উপজেলা পরিষদের ৪ বারের নির্বাচিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং বান্দরবান জেলা মহিলা দলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শিরিনা আক্তার, বিএনপির সাবেক নেতা মরহুম হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরী, সাবেক এমপি মকবুল হোসেনের (লেচু মিয়া) মেয়ে সৈয়দা আদিবা হোসেন রয়েছেন আলোচনায়।
সংরক্ষিত আসনের সাবেক এমপি নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ছাত্রজীবন থেকে দলের সঙ্গে আছি। গত ১৭ বছর আওয়ামী সরকারের নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হয়েছি। তবে দল ছেড়ে কোথাও যাইনি। আশা করি, দলের হাইকমান্ড ত্যাগীদের মধ্যে থেকেই নির্বাচন করবেন কারা সংসদে যাবে।
গৌরীপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান তানজিন চৌধুরী লিলি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হই। এরপর মূল ধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হই। বিগত দিনে সব আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ছিলাম। আমি বিশ্বাস করি, দল আমার বিগত দিনের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করবে।
ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেত্রী আরিফা সুলতানা রুমা বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছি। কখনো দল ছেড়ে যাইনি। কারও সঙ্গে আঁতাতও করিনি। আমার প্রত্যাশা দুর্দিনের নেতাকর্মীদের দলের হাইকমান্ড যাতে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে।কাবে