বাংলার প্রতিচ্ছবি: বছরের পর বছর ধরে ফরিদপুর সুগার মিলের অপরিশোধিত বিষাক্ত তরল বর্জ্যে আখ মাড়াই মৌসুমে দূষিত হচ্ছে চন্দনা নদীর পানি।
ফরিদপুর জেলার মধুখালী পৌরসভার থানা গেট এলাকার শ্মশান ঘাট থেকে শুরু করে ভাটির দিকে চন্দনা নদীর পানি এ দূষণের শিকার হচ্ছে।
সম্প্রতি ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মিল থেকে নির্গত অপরিশোধিত বর্জ্যপানি একটি খালের মাধ্যমে চন্দনা নদীতে গিয়ে মিশছে। নদীর উজানে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে অবস্থিত ফরিদপুর সুগার মিলটি ওই খাল দিয়েই বর্জ্য ছাড়ে। মিল এলাকা অতিক্রম করার সময় তীব্র রাসায়নিক দুর্গন্ধে পথচারীদের নাক-মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে চলাচল করতে দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পৌরসভার চারটি ভাটির গ্রামের অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিকের দুর্গন্ধ ও নদীর পানি দূষণের কারণে ভোগান্তিতে আছেন। খালটি বিদ্যালয় ও বাজারের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় মধুখালি আইডিয়াল একাডেমি ও ফরিদপুর চিনি কল উচ্চ বিদ্যালয়ের দেড় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এবং মিল গেট বাজারের ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মিল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই এ দুর্ভোগ চলছে।
তাদের ভাষ্য, যেখানে অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে মিশছে, সেখানে মাঝেমধ্যে পানিতে মৃত মাছ ভেসে উঠতে দেখা যায়।
ফরিদপুর চিনি কল সূত্র জানায়, সরকারি উদ্যোগে ১৯৭৪ সালে মিলটি স্থাপন করা হয় এবং ১৯৭৬ সালে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফরিদপুর চিনি কল উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, 'তীব্র রাসায়নিক দুর্গন্ধের কারণে ক্লাসে মনোযোগ দেওয়া যায় না। বাড়িতেও এই গন্ধ থাকে।'
মিলের পাশে অবস্থিত আইডিয়াল একাডেমির গভর্নিং বডির সদস্যরা বলেন, 'অপরিশোধিত বর্জ্যপানির দুর্গন্ধে আমাদের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। বিষয়টি মিল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো সাড়া পাইনি।'
চর মহিষাপুর গ্রামের বাসিন্দা ও মিল গেট বাজারের ব্যবসায়ী মো. লতিফ (৫৬) বলেন, 'খালটি আমাদের দোকানের পাশ দিয়ে বয়ে যায়। আখ মাড়াই মৌসুমজুড়ে খালের পানির দুর্গন্ধে ক্রেতারা কয়েক মিনিটও দাঁড়াতে চান না।'
সম্প্রতি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিব হোসেন জানান, মিলের বর্জ্যের কারণে নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এ বিষয়ে মিল কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
ফরিদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসরিন জাহান বলেন, 'চন্দনা নদী এ এলাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত ১৮ জানুয়ারি জেলা সমন্বয় সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে।' ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় বিষাক্ত পানির কারণে নদীর মাছ মারা যেতে দেখেছেন তিনি।
পরিবেশ অধিদপ্তর ফরিদপুরের উপপরিচালক সাঈদ আনোয়ার বলেন, 'একজন পরিদর্শককে এলাকায় পাঠানো হবে। পরিদর্শন শেষে মিল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।'
মধুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রওশনা জাহান বলেন, 'মিল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে তাদের ইটিপি রয়েছে এবং তারা নিজেদের পুকুরে বর্জ্যপানি ফেলে। তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টির দ্রুত সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।'
এ বিষয়ে ফরিদপুর সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক ফারহাদ বলেন, 'চুন ও সালফার ডাই-অক্সাইড পানির সঙ্গে মিশে তীব্র দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে। আমরা মিলের নিজস্ব পুকুরের পানি ব্যবহার করি। তবে তরল হওয়ায় কিছু পানি মাটির নিচ দিয়ে চুঁইয়ে নদীতে যেতে পারে। ভবিষ্যতে যাতে কোনোভাবেই পানি নদীতে না যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'