'বাংলার প্রতিচ্ছবি'র অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও সরেজমিন চিত্র:
রাজধানীর ধানমন্ডি জিগাতলা বাস স্ট্যান্ড সংলগ্ন বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত ২১/১, ২১/এস নম্বরের ‘বায়তুল নূর জামে মসজিদে’ এক ভয়াবহ ও পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার সামগ্রিক ধরন, উদ্ধারকৃত আলামত ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে স্থানীয় মুসল্লি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দৃঢ় ধারণা—এটি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা বা চুরি নয়; বরং মসজিদ সম্পত্তি দখলের এক গভীর ও সুপরিকল্পিত নাশকতামূলক ষড়যন্ত্র।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ভোর আনুমানিক ৬:০০ হতে ৭:৩০ ঘটিকার মধ্যে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটানো হয়। ফজরের নামাজ শেষে মুসল্লিরা মসজিদ ত্যাগ করলে দুর্বৃত্তরা পেছনের জানালার গ্রিল কেটে ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরে ঢুকে তারা প্রথমে দানবাক্সগুলো ভেঙে ফেলে। তবে উল্লেখযোগ্য অর্থ না পেয়ে দুর্বৃত্তরা মসজিদের মূল ক্ষতিসাধনে লিপ্ত হয়। তারা নিচতলার কার্পেট, চেয়ার, টেবিল এবং পবিত্র মিহরাবের নিকটবর্তী সমস্ত আসবাবপত্র এক স্থানে স্তূপ করে পরিকল্পিতভাবে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং কাজ শেষে পূর্ব-দক্ষিণ পাশের দরজা খুলে পালিয়ে যায়।
অগ্নিকাণ্ডের ফলে নিচতলার টিউব লাইটসহ সকল বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম তীব্র তাপে বিনষ্ট হয়ে গেছে। সৌভাগ্যবশত দরজাপত্র বন্ধ থাকায় আগুন চারদিকে ব্যাপকভাবে ছড়াতে পারেনি। মসজিদের দ্বিতীয় তলায় বসবাসরত ইমাম ও মোয়াজ্জেমকে সময়মতো সতর্ক করেন তৃতীয় তলার এক ভাড়াটিয়া। পরবর্তীতে দ্রুত ফায়ার সার্ভিস, ডিপিডিসি ও ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা হলে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনে। খবর পেয়ে হাজারীবাগ থানার ডিউটিরত পুলিশ কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
'বাংলার প্রতিচ্ছবি'র মুখোমুখি মসজিদের ইমাম ও পরিচালনা কমিটি
ঘটনার ভয়াবহতা জানতে ‘বাংলার প্রতিচ্ছবি’-র অনুসন্ধানী টিম সরাসরি ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় ‘বাংলার প্রতিচ্ছবি’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মসজিদের পরিচালনা কমিটির প্রতিনিধি ও ইমাম সাহেব ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন:
"এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন চুরি বা দুর্ঘটনা নয়। ‘বাংলার প্রতিচ্ছবি’-র মাধ্যমে আমরা দেশবাসীকে জানাতে চাই, একটি চিহ্নিত অসাধু ও স্বার্থান্বেষী মহল দীর্ঘদিন ধরে এই মসজিদের মূল্যবান বাণিজ্যিক সম্পত্তি হস্তগত করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। সেই উদ্দেশ্যেই পবিত্র মিহরাব লক্ষ্য করে এই আগুন দেওয়া হয়েছে। আমাদের আশঙ্কা, এটি একটি বৃহত্তর চক্রান্তের প্রথম ধাপ মাত্র। ভবিষ্যতে হয়তো মুসল্লিরা নামাজরত অবস্থায় ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মসজিদটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করানোর দূরভিসন্ধি রয়েছে তাদের। আমরা ‘বাংলার প্রতিচ্ছবি’-র নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার প্রতি আস্থা রেখে প্রশাসনের কাছে অপরাধীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।"
কেন এটি সুপরিকল্পিত নাশকতা? — আলামত ও বিশ্লেষণ
তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিশ্লেষণে এই অগ্নিসংযোগের পেছনে ৪টি স্পষ্ট নাশকতামূলক প্রমাণ মিলেছে: ১. অর্থ লুট মূল উদ্দেশ্য নয়: দানবাক্স ভাঙা হলেও তাতে অর্থ না থাকায় পুরো মসজিদে আগুন দেওয়া প্রমাণ করে মূল লক্ষ্য ছিল পবিত্র ধর্মীয় স্থানটি ধ্বংস করা। ২. পরিকল্পিত প্রবেশ ও পলায়ন: গ্রিল কেটে সুনির্দিষ্ট পথ দিয়ে প্রবেশ এবং আগে থেকেই চিহ্নিত দরজা দিয়ে নিরাপদে কেটে পড়া নিখুঁত পূর্ব-পরিকল্পনার সাক্ষ্য দেয়। ৩. মিহরাবে আঘাত: পবিত্র মিহরাবের নিকট আসবাবপত্র একত্রিত করে আগুন দেওয়া সরাসরি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার সুনির্দিষ্ট টার্গেট। ৪. টাইমিং ও পর্যবেক্ষণ: ফজরের ঠিক পরপরই নির্জন সময় বেছে নেওয়া দীর্ঘদিনের রেকি ও নজরদারিরই ফল।
এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় এই অগ্নিকাণ্ড সময়মতো ধরা না পড়লে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল।
রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও ন্যায়বিচারের দাবি
ঘটনায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন স্থানীয় সাধারণ জনগণ ও মুসল্লি সমাজ। পবিত্র আল্লাহর ঘরে এই হামলার বিচার চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের তদারকিতে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধারকৃত আলামত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ও ষড়যন্ত্র রোধে সারাদেশের সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারকদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। ‘দৈনিক বাংলার প্রতিচ্ছবি’ সততার সঙ্গে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের শেষ পর্যন্ত সত্য তুলে ধরতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।