বাংলার প্রতিচ্ছবি: জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে অচল হয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের পণ্যবাহী লাইটার জাহাজ ও সাগরে মাছ ধরার ফিশিং ট্রলারগুলো। চাহিদার তুলনায় ডিজেল সরবরাহ ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে এখন শত শত ট্রলার ও লাইটার জাহাজ অলস বসে আছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ফিশারি ঘাটে। গত ছয় দিন ধরে ঘাটে মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে মাছের দাম বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একই সাথে রফতানি পণ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত বেসরকারি ডিপোগুলোতেও (অফডক) জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
লাইটার জাহাজ মালিকদের সংগঠন বিডব্লিউটিসিসি জানিয়েছে, প্রতিদিন গড়ে ৭০-৮০টি লাইটার জাহাজ বুকিং হয়, যার জন্য আড়াই লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা অয়েল কোম্পানি থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ হাজার লিটার। এই অপ্রতুল জ্বালানি নিয়ে জাহাজ চালানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন মালিকরা। সংকটের সমাধান চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী বরাবর দুই দফায় চিঠি দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান মেলেনি। ফলে বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও দেশের ৫০টি অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহনের খরচ সড়কপথের তুলনায় চারগুণ কম হলেও নৌপথের এই সংকটকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই চিত্র দেখা গেছে বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতেও। চট্টগ্রামের ২১টি ডিপোর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দিনে গড়ে ৬০-৬৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু প্রধান তিনটি জ্বালানি সরবরাহকারী কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় রফতানি পণ্য ব্যবস্থাপনা ও আমদানি পণ্য খালাস কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খলিলুর রহমান এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যানকে লিখিতভাবে অবহিত করেছেন।
এদিকে জ্বালানি সংকটে মৎস্য খাতেও হাহাকার শুরু হয়েছে। ফিশিং ট্রলার মালিকরা জানিয়েছেন, বড় ট্রলারগুলো সাগরে যেতে ৪ হাজার লিটার তেলের প্রয়োজন হলেও তা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সাগরে মাছ ধরা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তার দাবি ৩০-৪০ শতাংশ কমলেও বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ বলে দাবি জেলে ও ব্যবসায়ীদের। হাতেগোনা কয়েকটি ট্রলার সাগরে গেলেও তেলের অভাবে নির্ধারিত সময়ের আগেই তারা ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। এর ওপর আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে টানা ৫৮ দিনের মাছ ধরার সরকারি নিষেধাজ্ঞা। একদিকে তেলের সংকট, অন্যদিকে দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে জেলে, আড়তদার ও শ্রমিকসহ মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের কর্মসংস্থান এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
জ্বালানি সংকটের এই প্রলম্বিত প্রভাব শুধু চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং দেশের সামগ্রিক সরবরাহ চেইন ও মৎস্য বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। দ্রুত ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক করা না হলে চট্টগ্রাম বন্দরে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।