বাংলার প্রতিচ্ছবি: গ্যাস,বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে তিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার। প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকট সামাল দিতে গিয়ে প্রথমেই চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে ওই সরকারকে। এছাড়া আসন্ন রমজান মাস, সেচ মৌসুম ও গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে গিয়ে নতুন সরকারকে হিমশিম খেতে হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এ বছর পর্যাপ্ত জ্বালানির জোগান না থাকলে লোডশেডিং সামাল দেওয়া সরকারের জন্য হবে কষ্টের। তৃতীয়ত, অন্তর্বর্তী সরকার বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিরাট অঙ্কের পাওনা পরিশোধ করতে পারেনি। ফলে নতুন সরকারকে এই পাওনা পরিশোধের বিশাল বোঝাও তাদের কাঁধে তুলে নিতে হবে। আর এই পাওনা শোধ না হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে না।
এরই মধ্যে দেশে ১ হাজার থেকে ১২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং শুরু হয়েছে। রোজায় বিদ্যুতের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পেলে তখন ২ হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুতের লোডশেডিং হওয়ার আশঙ্কা আছে। গত ২১ জানুয়ারি বিদ্যুৎ বিভাগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে ভার্চুয়াল আন্তমন্ত্রণালয় সভায় পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয় যে, অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন ক্রমেই কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বিঘ্নিত হতে পারে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, আবাসিকে এখন গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ খুবই কম। তিতাসের চাহিদা দৈনিক ২৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের, কিন্তু পাচ্ছে ১৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিস অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শাহরিয়ার জানান, গ্যাসের সংকটে সিএনজি, এলপিজি ও ডিজেল দিয়ে উৎপাদন ধরে রাখতে গিয়ে মালিকদের উৎপাদন খরচ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প মালিকদের কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুুঁকিতে আছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ২০৩০-এর পর প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ এতই কমে যাবে যে বাণিজ্যিকভাবে তা ব্যবহার করা যাবে না। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের তেমন অগ্রগতি নেই। জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং পুরোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কমে যাওয়ায় আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ খাত তীব্র সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। চলতি বছর সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। গ্রীষ্মে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে দেড় থেকে ২ হাজার মেগাওয়াটের লোডশেডিং হওয়ার শঙ্কা আছে। আর এ সময় রমজান থাকায় গ্রাহকের ভোগান্তিও বাড়বে। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) আসছে রমজান, জাতীয় নির্বাচন, সেচ মৌসুম ও গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত ৩৮ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে। আর এ ভর্তুকি না পেলে আগামী মাস থেকেই দেশজুড়ে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং শুরু হতে পারে বলে সংস্থাটি আশঙ্কা করছে। আবার গ্যাসসংকটের জন্য গরম ও রমজানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর এক-তৃতীয়াংশ অব্যবহৃত থাকবে।
পিডিবি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে গ্রিডভিত্তিক মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বাস্তবে এ সক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎ জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে গ্যাসসংকটে এ সমস্যা বেশি হচ্ছে। দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে বিল পরিশোধ না হওয়ায় জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা যাচ্ছে না। ব্যাংক ঋণের সুদ ও সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ না হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়ছে। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসানাত বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের এক একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকের ছয় থেকে সাত মাস করে সরকারের কাছে বকেয়া আছে। বকেয়া না পেলে এলসি খুলতে পারব না। তখন তেলও আমদানি করতে পারব না। আর তেল না পেলে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখা সম্ভব হবে না।