বাংলার প্রতিচ্ছবি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) একটি অতিথি কক্ষ (গেস্টরুম) ডাকসুর ‘নাগরিক সেবা কেন্দ্র’ করার জন্য বরাদ্দ দেওয়া নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। টিএসসির পরিচালক ফারজানা বাশার অভিযোগ করেছেন, ডাকসু নেতারা চাপ দিয়ে তাকে রুমটি বরাদ্দ ও খালি করতে বাধ্য করছেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ডাকসু নেতাদের দাবি, যথাযথ প্রক্রিয়া ও লিখিত সম্মতির মাধ্যমেই এই বরাদ্দ সম্পন্ন হয়েছে।
টিএসসির পরিচালক ফারজানা বাশার জানান, ডাকসুর ক্যারিয়ার উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম এবং সহ-সভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম তার ওপর চাপ প্রয়োগ করে রুমটি বরাদ্দ ও খালি করতে বাধ্য করেছেন।
ফারজানা বাশার অভিযোগ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষ বা ‘হায়ার অথরিটি’ এই কক্ষ বরাদ্দের বিষয়ে তার সাথে কোনও আগাম যোগাযোগ করেনি। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “এস্টেট অফিস থেকে একজন লোক এসে আমাকে বলেন, ‘আপা, ম্যানেজার এটা সই করে দিতে বলেছেন’। এর মধ্যেই ডাকসুর ক্যারিয়ার উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম আমার রুমে ঢুকে পড়েন এবং সই করার জন্য চাপ দিতে থাকেন।”
ফারজানা বাশার আরও জানান, শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুর ২টা ২০ মিনিটের দিকে নামাজ ও খাবারের বিরতির কথা বলে তিনি তাদের বিকাল সাড়ে ৩টায় আসতে বলেন। এ সময় মাজহার তাকে ‘ধমক’ দিয়ে বলেন, “ভালোয় ভালোয় দিয়ে দেন, নইলে এগুলা রেকর্ড হয়ে থাকবে।” শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির চাপে তিনি ওই দিন ফাইলে সই করতে বাধ্য হন বলে জানান।
পরিচালক আরও অভিযোগ করেন, এস্টেট অফিসার নিজেই মাজহারকে সঙ্গে নিয়ে এসে কক্ষ পছন্দ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “মাজহারের ১ নম্বর রুমটি পছন্দ হওয়ায় সেটি ডাকসুকে দিয়ে দেওয়ার নির্দেশ আসে।”
পরবর্তী সময়ে রুম খালি করার বিষয়েও তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান তিনি। ফারজানা বাশার বলেন, “গত শনিবার মাজহার ফোন করে রুম খালি করতে বললে আমি অসম্মতি জানাই। তখন সে ফোন কেটে দিয়ে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমকে নিয়ে কনফারেন্স কলে কথা বলে। আমি যখন সাদিককে জিজ্ঞেস করলাম ডাইনিংয়ের মালামালগুলো কোথায় রাখবো, তখন সে সাফ জানিয়ে দেয়—‘আপনি কোথায় রাখবেন আমি কি জানি? আপনি ঝামেলা করলে আমরাও আপনার সঙ্গে ঝামেলা করবো’।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাকসু নেতা মাজহারুল ইসলাম বলেন, “টিএসসি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রস্থল। বিজ্ঞান অনুষদ ও হল পাড়ার শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থেই এই স্থানটি নির্বাচন করা হয়েছে, যাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই দ্রুত সেবা পান।”
প্রশাসনের বক্তব্য: ‘যথাযথ প্রক্রিয়া ও লিখিত সম্মতিতেই বরাদ্দ’
টিএসসির পরিচালকের অভিযোগের বিপরীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা জানিয়েছেন, কক্ষ বরাদ্দের পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, “নাগরিক সেবা কেন্দ্রের জন্য একটি আবেদন আসার পর টিএসসির পরিচালকের কাছে তার মতামত চাওয়া হয়েছিল। তিনি ইতিবাচক মতামত দেওয়ার পর সেটি ‘নোট’ আকারে আসে এবং পরবর্তীতে তা অনুমোদন করা হয়।” তিনি আরও যোগ করেন যে যেকোনও লিখিত আবেদন আসার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের (এক্ষেত্রে টিএসসি) মতামতের ভিত্তিতেই তা প্রসেস করা হয়ে থাকে।
একই সুরে কথা বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত এস্টেট ম্যানেজার ফাতেমা বিনতে মুস্তফা। সরাসরি কল দিয়ে চাপ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “ফোন করে রুম দেওয়ার বিষয়টি সম্ভব নয়। প্রো-ভিসির মাধ্যমে আসা নথিতে (নোটিং) টিএসসির পরিচালক নিজেই লিখে দিয়েছেন যে—‘নাগরিক সেবা সেন্টারের জন্য এই রুমটি ব্যবহার করা যেতে পারে, টিএসসির পরিচালকের আপত্তি নেই’।”
এস্টেট ম্যানেজার আরও স্পষ্ট করেন, তিনি কেবল মতামতের জন্য নোট পাঠিয়েছিলেন। পরিচালক চাইলে অমত দিতে পারতেন। তার দাবি, প্রো-ভিসির অনুমোদনসহ সব নথিপত্র বর্তমানে লিখিত আকারে সংরক্ষিত আছে।
বরাদ্দকৃত কক্ষের গুরুত্ব ও পরিচালকের অনড় অবস্থান
টিএসসির পরিচালক ফারজানা বাশারের দাবি, উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনও আলোচনা ছাড়াই এই কক্ষ বরাদ্দের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়েছে। যদিও উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) এবং ডাকসু নেতৃত্বের দাবি—সব প্রক্রিয়া যথাযথভাবেই সম্পন্ন হয়েছে এবং পরিচালকের লিখিত সম্মতি নেওয়া হয়েছে।
কক্ষটির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ফারজানা বাশার বলেন, “বরাদ্দ দেওয়া ওই রুমটি মূলত একটি ডাইনিং রুম ছিল। সেখানে ডাইনিং টেবিল, চেয়ার, ফ্রিজ ও ওভেনসহ যাবতীয় সরঞ্জাম ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা বিদেশি অতিথি ও বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেখানে অবস্থান করেন এবং অনেকে নিজেরা রান্না করে খান। রুমটি ছোট হলেও বেশ গোছানো ছিল। এখন বলা হচ্ছে অন্য কোথাও ডাইনিং করার জন্য, যা অতিথিদের জন্য অসুবিধাজনক হবে।”
উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশার সঙ্গে নিয়মিত সভা হলেও কক্ষ বরাদ্দের বিষয়ে কোনও কথা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। ফারজানা বাশার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিদিশা ম্যামের সাথে আমার প্রতিদিন কোনও না কোনও মিটিং থাকে, কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে আমাকে আগে কিছুই বলেননি।”
নিজের প্রশাসনিক অবস্থানের বিষয়ে অনড় থেকে তিনি আরও জানান, উপযুক্ত সময়ে তিনি এ বিষয়ে ‘সংবাদ সম্মেলন’ করবেন। তিনি বলেন, “প্রশাসন আমাকে না রাখলে আমি থাকবো না, কিন্তু যতক্ষণ দায়িত্বে আছি, আমি আমার মতো করেই থাকবো। কারও তাঁবেদারি করে আমি দায়িত্ব পালন করবো না।”
এদিকে টিএসসিতে নাগরিক সেবাকেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু করতে গিয়ে অতিথি কক্ষের সামনের ‘প্যালেস্টাইন কর্নার’ নামে পরিচিত একটি দেয়ালচিত্র মুছে ফেলায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, নীলক্ষেত এলাকায় ইতোমধ্যে একটি নাগরিক সেবাকেন্দ্র রয়েছে বলে জানান কেন্দ্রের উদ্যোক্তা রাজিত খান।