বাংলার প্রতিচ্ছবি: আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন জোট, প্ল্যাটফর্ম বা উদ্যোগের আবির্ভাব নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন সামনে এলে এমন উদ্যোগ আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কখনও ভোট বা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, আবার কখনও মতাদর্শিক অবস্থান থেকে এসব প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে। সরাসরি নির্বাচনে অংশ না নিয়েও কেউ কেউ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারার পক্ষে কাজ করে থাকে।
এই বাস্তবতায় চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে নতুন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)। সংশ্লিষ্টদের মতে, গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষা—এই পাঁচটি মূলনীতিকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু করেছে প্ল্যাটফর্মটি।
মূলত জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় থাকা বাম ও মধ্যপন্থি তরুণদের উদ্যোগে গঠিত এই প্ল্যাটফর্মে রয়েছেন তিনজন মুখপাত্র এবং ১০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল। তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জাতীয় নাগরিক কমিটির সাবেক নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন অরাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরাও এতে যুক্ত হয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও নিজেদের আদর্শিক অবস্থান থেকে রাজনৈতিক ভূমিকা রাখবেন।
গত শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে নেতারা জানান, চলমান রাজনীতিতে একটি নৈতিক ও গণতান্ত্রিক চাপ তৈরির লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
বর্তমান রাজনীতি নিয়ে তাদের অবস্থান
ঘোষণাপত্রে এনপিএ নেতারা অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের নানা উদ্যোগ নিলেও দেড় বছর পর ভিন্ন চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিসরের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।
তাদের মতে, পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ভাষা ও চর্চার পুনরুত্থান ঘটছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংখ্যাগুরুর পাশাপাশি সংখ্যালঘুর কণ্ঠস্বর নিশ্চিতের যে গণতান্ত্রিক ধারণা, তার লঙ্ঘন হচ্ছে। ধর্মীয়, জাতিগত ও লৈঙ্গিক পরিচয়ের সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন ক্রমেই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। প্রায় সব রাজনৈতিক শক্তিই কোনও না কোনওভাবে নারী, সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি অবিচারমূলক আচরণ করছে।
এনপিএ নেতাদের ভাষ্য, এসব বাস্তবতার বিপরীতেই জুলাই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। কিন্তু জুলাইকে পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করা সংগঠনগুলো প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। সেই শূন্যতা থেকেই বিবেকের দায়ে এই প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে কতটা প্রভাব?
নতুন এই প্ল্যাটফর্ম চলমান রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে—তা নিয়ে আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জাতীয় রাজনীতিতে নতুন প্ল্যাটফর্মের আবির্ভাব গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে প্রভাবের প্রশ্নে বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের পর গত দেড় বছরে তরুণরা বারবার আশা ভঙ্গের শিকার হয়েছেন। অনেকে বড় প্রত্যাশা নিয়ে এনসিপিতে যুক্ত হলেও তারা তরুণদের পালস বুঝতে পারেননি। নতুন বন্দোবস্তের কথা বাদ দিয়ে শেষ পর্যন্ত পুরোনো দল জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন। ফলে তরুণরা হয়তো ভিন্ন কিছু করতে চাইছেন। তবে তাদের আদর্শ কী, সেটি আগে স্পষ্ট হতে হবে।’
সাইফুল হকের মতে, চলমান রাজনীতিতে এনপিএ তাৎক্ষণিকভাবে বড় প্রভাব ফেলতে না পারলেও ভবিষ্যতে একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কারা আছেন এনপিএতে
নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)-এর তিন মুখপাত্র হলেন ফেরদৌস আরা রুমী, মঈনুল ইসলাম তুহিন (তুহিন খান) ও নাজিফা জান্নাত। ফেরদৌস আরা রুমী ও তুহিন খান লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে পরিচিত। নাজিফা জান্নাত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী।
১০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে অন্যান্যদের সঙ্গে রয়েছেন এনসিপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায়, সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব তুহিন খান, সাবেক উত্তরাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক অলিক মৃ এবং সাবেক কালচারাল সেলের উপপ্রধান সৈয়দা নীলিমা দোলা।
নতুন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ) (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)
নতুন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ) (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)
এছাড়া জাতীয় নাগরিক কমিটির সাবেক সদস্য সৈয়দ ইমতিয়াজ নদভী, শিক্ষক অলিউর সান, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি বাকী বিল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসু ও সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সহসমন্বয়ক নূমান আহমাদ চৌধুরী এবং অ্যাক্টিভিস্ট রাফসান আহমেদও রয়েছেন।
নির্বাচনি রাজনীতিতে ভূমিকার ইঙ্গিত
এনপিএর সদস্য ও এনসিপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জুলাইয়ের চেতনা ধরে রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য। এবারের নির্বাচনে তারা সরাসরি অংশ নেবেন না, তবে সুস্থ ধারার রাজনীতির পক্ষে অবস্থান নেবেন এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক যেকোনও অন্যায়ের বিরোধিতা করবেন।
এনপিএর আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাসদ (মার্কসবাদী) নেত্রী ও ঢাকা-৭ আসনের এমপি প্রার্থী সীমা দত্ত বলেন, “এটি কোনও নির্বাচনি জোট নয়, বরং একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রাথমিক উদ্যোগ। সামাজিক ও গণতান্ত্রিক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করাই তাদের উদ্দেশ্য। তার মতে, এমন প্ল্যাটফর্ম সক্রিয় থাকলে রাজনীতিতে অনৈতিক আচরণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নতুন এই প্ল্যাটফর্মকে তারা স্বাগত জানান। তার ভাষায়, এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া সবারই গণতান্ত্রিক অধিকার।
তবে তিনি বলেন, “তারা বলছে সবাইকে নিয়ে চলতে চায়, আবার নিজেদের মধ্যমপন্থি বলেও দাবি করছে। কিন্তু আমি মনে করি, আগে তাদের আদর্শিক অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। কারণ মধ্যমপন্থা বলে আসলে কিছু নেই। রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলে পাগল। তাই তাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ জরুরি। তা না হলে তারা আরেকটি রাজনৈতিক জট হিসেবেই পরিচিত হতে পারে।
আগামী নির্বাচনে এই প্ল্যাটফর্ম কতটা প্রাসঙ্গিক হবে—সে বিষয়ে বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, সেটি নির্ভর করবে তাদের বাস্তব কর্মকাণ্ডের ওপর।