বাংলার প্রতিচ্ছবি: মণিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজার। গত ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রানা প্রতাপ বৈরাগী নামে এক ব্যবসায়ীকে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েকজন দুর্বৃত্ত ডেকে নিয়ে যান পাশেই কপালিয়া ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনের গলিতে। এরপর দুর্বৃত্তরা খুব কাছ থেকে তাকে চারটি গুলি ও গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা জানান, রানা মাছ ও বরফকলের ব্যবসার পাশাপাশি একসময় জড়িত ছিলেন নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি দলে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ কয়েকটি গুলির খোসা উদ্ধার করে। ফরেনসিক রিপোর্টে তথ্য মিলেছে, সিক্স পয়েন্ট ফাইভ এমএম মডেলের বিদেশি পিস্তলে এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে।
আগে ৩ জানুয়ারি শহরের শংকরপুর এলাকায় মোটরসাইকেলে করে বাড়িতে ফিরছিলেন ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন। সে সময় কয়েকজন যুবক আরেকটি মোটরসাইকেলে এসে আলমগীরকে গুলি করে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা তাকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্তের পর গুলির ফরেনসিক রিপোর্টে উঠে এসেছে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বেরেটা এম নাইন মডেলের পিস্তল।
এই দুটি হত্যাকাণ্ড নয়; গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত যশোরে হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৬২টি। থেমে নেই ধর্ষণ, চাঁদাবাজি কিংবা ছিনতাই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বিদেশি পিস্তলের মাধ্যমে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে যেভাবে অস্ত্র ঢুকছে, এ রকম পরিস্থিতি কয়েক বছর আগেও ছিল না। এখন মাদকের সঙ্গেও আনা হচ্ছে অস্ত্র। নির্বাচনি ডামাডোলে অস্ত্রের চাহিদা বাড়ায় অস্ত্র কারবারিদের সঙ্গে নতুন করে যোগ দিয়েছে মাদক ও মানবপাচারকারী চক্রও। রাজনীতিক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনীতিক পট পরিবর্তনের পর চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের আটক না হওয়ার পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়াতে অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়াতে সন্ত্রাসীদের কাছে আসছে বিদেশি অস্ত্র। কার্যত অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে।
মানবাধিকারকর্মী ও ব্লাস্ট যশোরের সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোস্তফা হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আমরা উদ্বিগ্ন। যশোরসহ সারা দেশে ব্যাপকভাবে অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। যশোরে সম্প্রতি যেসব হত্যার ঘটনা ঘটেছে, সবগুলোই মাথায় গুলির ঘটনা। সীমান্তবর্তী জেলাতে অবাধে অস্ত্র ঢুকছে; তবে ধরা পড়ছে একটি দুটি। নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সীমান্তে অস্ত্র প্রবেশ আটকাতে না পারলে আগামী নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’
যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলার ২৪০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত ভারত সীমান্ত। নদী, ঘন বনজঙ্গল ও সমতল ভুমি ও সীমান্তের তারকাটা ঘেঁসা স্থানে দু দেশের মানুষের বাড়ি থাকাতে যেকোনও চোরাকারবারিদের তৎপরতা বেশি এখানে। যশোর সীমান্তে ১১টি রুটে প্রতিদিন অবৈধ অস্ত্রসহ বিভিন্ন চোরাচালান পণ্য বাংলাদেশে ঢুকছে। যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা, শার্শা, শাহজাদপুর, হিজলা, পুটখালি, আন্দুলিয়া, মান্দারতলা, বেনাপোল সীমান্তের গোগা, কায়বা, শিকারপুর দিয়ে অস্ত্র-বিস্ফোরক অহরহ ঢুকছে। সম্প্রতি ও অতীতের সব অস্ত্র-বিস্ফোরক চালান আটক এবং বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার অস্ত্র ব্যবসায়ীদের জবানিতে এমন তথ্য বারবার উঠে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অবৈধ অস্ত্র আসে যশোর সীমান্ত দিয়ে। ভারত থেকে স্থানীয়ভাবে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও অন্ধ্র প্রদেশে নির্মিত অনেক অস্ত্র আসছে। এগুলোর মধ্যে বিহারের মুঙ্গেরে তৈরি ‘কাট্টা রাইফেল’, বেলঘরিয়ার ‘বেলঘরিয়া পিস্তল’, খিদিরপুরের ‘ছক্কা পিস্তল’ ও মুর্শিদাবাদের ‘ময়ূর পিস্তল’ রয়েছে। তবে ইদানীং নাইন এমএম পিস্তল ও সিক্স পয়েন্ট ফাইভ এমএম পিস্তল, রিভলবার (পয়েন্ট ৩৮ ও পয়েন্ট ৩২ বোর) ধরনের আধুনিক সব অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। আকারে ছোট হওয়ায় চোরাইপথে এসব অস্ত্র আনা সহজ হয় এবং সহজে লুকিয়ে রাখা যায় বলে ব্যবহারকারীরাও এসব অস্ত্র বেশি পছন্দ করে।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় অস্ত্রের চালান আটক হয়েছে গত বছরের ৩০ নভেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সেভেন পয়েন্ট সিক্সটিভাইভ মডেলের পাঁচটি বিদেশি পিস্তল, দশটি ম্যাগাজিন ও ৫০ রাউন্ড গুলি, সাড়ে চার কেজি গাঁজাসহ লিটন গাজী (৪০) নামে এক যুবককে আটক করে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। শার্শা সীমান্ত দিয়ে পিস্তুলগুলো ভারতে প্রবেশ করলেও ধরা পড়ে যশোর শহরে। জিজ্ঞাসাবাদে আটক যুবক পুলিশকে জানায়, অস্ত্রগুলো কক্সবাজারে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল। সে পিস্তলটির বাহকমাত্র, ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ তার পরিচিত নয়।
চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি বেনাপোল রঘুনাথপুর এলাকায় সাকিব নামে এক যুবকের বাড়িতে দুটি পিস্তল ও ৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, সাকিবের বিরুদ্ধে আগে কখনও এ ধরনের কাজের অভিযোগ ছিল না। পুলিশের ধারণা, নির্বাচন উপলক্ষে অস্ত্রের চাহিদা বাড়াতে অস্ত্রের বাহকের পেশায় যোগদান করেছে সে। গত বছরের ৯ আগস্ট যশোরের বেনাপোলের পুটখালী সীমান্তে অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, ৫ রাউন্ড গুলি ও দুটি ম্যাগাজিনসহ আক্তারুল ইসলাম (৪০) নামে এক অস্ত্র ব্যবসায়ীকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। আটক আক্তারুল ইসলাম পুটখালী গ্রামের উত্তরপাড়ার বাসিন্দা। ২৯ মে যশোরের শার্শা উপজেলার পাঁচভুলোট সীমান্ত এলাকা থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি খালি ম্যাগাজিন ও দুটি মোবাইল ফোনসহ দুই অস্ত্র ব্যবসায়ীকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত দালালরা ক্রেতা ও বিক্রেতার যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়। বিক্রেতারা মাল দেওয়ার আগেই টাকা আদায় করে নেয়। হয়তো তারা যশোর শহরের কোনও এলাকায় টাকাটা নেবে। টাকা নেওয়ার পর শহরের বাইরের কোনও এলাকা থেকে অস্ত্রটি সংগ্রহ করতে বলবে। আজকাল অবশ্য হাতে হাতে টাকা নেওয়ার বদলে বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং মাধ্যমেও টাকা নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায়ই ক্রেতাকে অনুসরণ করে অস্ত্র বিক্রেতাদের ধরার চেষ্টা করে। আর তাই ক্রেতার হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার সময় বিক্রেতারা নানা কৌশল গ্রহণ করে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্বীকার করেছে, যে পরিমাণ অস্ত্র ঢুকছে তার তুলনায় ধরা পড়ছে কম।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আবুল বাশার বলেন, ‘সম্প্রতি যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তার সবগুলোই বিদেশি পিস্তলের মাধ্যমে। ভারত থেকে এসব পিস্তল যশোরে আসছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি চালান জব্দ করা হয়েছে। এরপর আসামিদের তথ্যের ভিত্তিতে আমরা অস্ত্রের উৎস, অস্ত্র উদ্ধার অব্যাহত রেখেছি।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘যাদের আটক করা হচ্ছে; তারা সবাই বাহক, অস্ত্র বিক্রেতা বা ক্রেতাকে এই বাহক নেনে না।;
তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে যশোরবাসীর বিচলিত হওয়ার কারণ নেই। অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধিতে জেলার ৪৯টি স্পটে নিয়মিত তল্লাশি করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এদিকে, আসন্ন নির্বাচনের আগে হঠাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে ক্ষুব্ধ রাজনৈতিক দলের নেতারাও। বিএনপি খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘বারংবার অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের আটকের দাবি জানালেও প্রশাসনের আন্তরিকতার অভাব দেখছি আমরা। সীমান্তবর্তী জেলা যশোরে অবাধে প্রবেশ করছে অস্ত্র। নির্বাচনের এই সময়ে অস্ত্র উদ্ধার ও প্রবেশ আটকাতে না পারলে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যাহত হবে।’
জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক অধ্যাপক শাহবুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেই পিস্তলের ব্যবহার দেখছি। এটা উদ্বেগের। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের আটকের দাবি জানাচ্ছি। তা না হলে যশোরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।’
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কেউ যাতে ভোটের পরিবেশে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে সেই লক্ষ্যে অস্ত্র উদ্ধারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।’