বাংলার প্রতিচ্ছবি: বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের গত সাত বছরে নগদ অর্থ ২৭ গুণের বেশি এবং ব্যাংক ঋণ প্রায় ২২ গুণ বেড়েছে।
এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আরএকে সিরামিকসের এই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেড়েছে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ। তবে বার্ষিক আয় কমেছে পৌনে চার গুণ। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, পাম জুমেরা ও মারসাতে আছে তিনটি ফ্ল্যাট। ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে ঋণ নিয়েছেন প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে সাতটি মামলা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে এসব মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন করেছেন তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামার সঙ্গে একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন একরামুজ্জামান। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে তিনি জয়ী হন। এর আগেই দল থেকে তাকে বহিষ্কার করে বিএনপি।
২০২৪ সালে রাজধানীর ঢাকা বোট ক্লাবে এক সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি। একই বছর ৭৫ সদস্য বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে একরামুজ্জামানকে উপদেষ্টা করা হয়।
যদিও তার দাবি, কমিটি ঘোষণার পরই তিনি পদত্যাগপত্র আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন।
একরামুজ্জামান এইচএসসি পাস। তার পেশা ব্যবসা। তিনি বর্তমানে ১২টি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। কিন্তু গত নির্বাচনের হলফনামায় তিনি ৩৩টি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে উল্লেখ করেছিলেন।
নাসিরনগর উপজেলার চাপরতলার বাসিন্দা সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের জন্ম ১৯৫৭ সালে। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৬৯ বছর। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনি হলফনামায় এইচএসসি পাস একরামুজ্জামান নিজেকে ব্যবসায়ী বলেছেন। একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।
তিনটি নির্বাচনের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত সাত বছরের ব্যবধানে একরামুজ্জামানের বার্ষিক আয় কমেছে পৌনে চার গুণ। বর্তমানে বছরে তার আয় চার কোটি ৪৬ লাখ ৩৩ হাজার ৫১৬ টাকা। এর মধ্যে ব্যবসা থেকে আয় দেখিয়েছেন ৬৩ লাখ ৮০ হাজার ৯৭৪ টাকা। বাড়িভাড়া থেকে আয় এক কোটি ১৬ লাখ ২৮ হাজার ৬১৩ টাকা, কৃষিখাত থেকে সাত লাখ ৬ হাজার ২৭৯ টাকা, শেয়ার-সঞ্চয়পত্র-ব্যাংক আমানত থেকে চার হাজার ২৪০ টাকা, চাকরি থেকে (আরএকে সিরামিকস-শ্যামল বাংলা মিডিয়া লিমিটেডের) ৫৮ লাখ ৩৮ হাজার ২৫০ টাকা, অন্যান্য থেকে দুই কোটি ১৫ হাজার ১৬০ টাকা।
তার গৃহিনী স্ত্রী নাঈমা আক্তার জাহানের আয় ছয় লাখ ২৩ হাজার ২০৫ টাকা। এর মধ্যে বাড়িভাড়া থেকে চার লাখ ৮২ হাজার ৫৫৮ টাকা এবং শেয়ার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র থেকে এক লাখ ৪০ হাজার ৬৪৭ টাকা।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় বছরে তার আয় ছিল প্রায় ৫৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, স্ত্রীর আয় ছিল চার লাখ ৪৩ হাজার টাকা। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় তার আয় ছিল ১৬ কোটি ৭৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ও স্ত্রীর আয় ছিল প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।
আয়কর বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একরামুজ্জামান চার কোটি ৮৫ লাখ ৩২ হাজার ৩৩৮ টাকা আয়কর দিয়েছেন। আয়কর রিটার্নে সম্পদ দেখিয়েছেন ২৬৫ কোটি তিন লাখ দুই হাজার ৯৭৫ টাকার। তার স্ত্রী নাঈমা জাহান আক্তার আয়কর দিয়েছেন ১৭ হাজার ৩২১ টাকা। আয়কর রিটার্নে সম্পদ দেখিয়েছেন দুই কোটি ১৭ লাখ ছয় হাজার ৭১৫ টাকার।
তাদের ছেলে সাইলিন জাহান আকবর আয়কর দিয়েছেন ১০ লাখ ৯৩ হাজার ৮৮৪ টাকা এবং সম্পদ দেখিয়েছেন ১১ কোটি ৩১ লাখ ৩৭ হাজার ৫৬৬ টাকার।
আরেক ছেলে কামার উজ জামান আয়কর দিয়েছেন ৪০ লাখ ৪৯ হাজার ৪৮০ টাকা এবং সম্পদ দেখিয়েছেন এক কোটি ২৪ লাখ ৪১ হাজার ৬১৬ টাকার।
অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদ, একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত সাত বছরের ব্যবধানে তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ, নগদ অর্থ এবং ব্যাংক ঋণ বেড়েছে।
একরামুজ্জামানের তিনটি হলফানামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাত বছরে তার অস্থাবর সম্পদ ৫৬ কোটি ২৩ লাখ ৪৪ হাজার ৩৮৭ টাকা বেড়ে হয়েছে ৪২১ কোটি ৯২ লাখ ১২ হাজার ৬৩৯ টাকার। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংকে জমা আছে ৩৭ লাখ সাত হাজার ৩৮৫ টাকা। শেয়ারে বিনিয়োগ ৩১৪ কোটি ২১ লাখ ৪২ হাজার ৯০৩ টাকা ও অন্যান্য থেকে আয় ৭৪ কোটি ৭৯ লাখ ১৩ হাজার ৯৭২ টাকা।
এর বাইরে নিজের নামে ৩০ হাজার টাকার সোনা, ১৮ লাখ টাকার বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য ও চার লাখ ৩৯ হাজার টাকার আসবাব আছে।
দুবাইয়ের পাম জুমেরায় ছয় কোটি ৮৫ লাখ ৪২ হাজার ৯৫৬ টাকার ২ হাজার ১৫৭ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, মারসায় এক কোটি ৩২ লাখ ৩০ হাজার টাকার এক হাজার ৪২০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট এবং বুর্জ খলিফায় দুই কোটি ৪৪ লাখ ৭৭ হাজার ৮৪০ টাকার ৯৮৭ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট আছে।
একরামুজ্জামানের নগদ অর্থ সাত বছরে ২৭ দশমিক ১৫ গুণ বেড়ে হয়েছে ২১ কোটি ৬৯ লাখ ২৮ হাজার ৫৮৩। গত নির্বাচনের সময় ছিল ২৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় ছিল ৭৯ লাখ টাকা।
বর্তমানে তার স্ত্রীর নামে অস্থাবর সম্পদ আছে মোট দুই কোটি ৭৯ লাখ ৯৮ হাজার ৮৬৫ টাকা। এর মধ্যে স্ত্রীর কাছে নগদ অর্থ আছে ২৫ লাখ ৪২ হাজার ৯৩৯ টাকা, ব্যাংকে ৩৯ লাখ ৫৪ হাজার ৯২৬ টাকা, শেয়ারে বিনিয়োগ দুই কোটি দুই লাখ এক হাজার টাকা, ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ও তিন লাখ টাকার আসবাব আছে।
গত নির্বাচনের সময় একরামুজ্জামানের অস্থাবর সম্পদ ছিল প্রায় ৪১৮ কোটি ৩২ লাখ টাকার এবং স্ত্রীর নামে প্রায় ৮১ লাখ ৬০ হাজার টাকার। ২০১৮ সালে তার অস্থাবর সম্পদ ছিল ৩৬৫ কোটি ৬৮ লাখ ৬৮ হাজার ২৫২ টাকার ও ১০ লাখ ৬২ হাজার ইউএই ডলার এবং স্ত্রীর নামে ছিল তিন কোটি ৪০ লাখ টাকার।
একরামুজ্জামানের স্থাবর সম্পদ আছে মোট ৮২ কোটি ৯৯ লাখ পাঁচ হাজার ৭১৭ টাকার। এর মধ্যে নাসিরনগর, মুক্তাগাছা, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ পাঁচ কোটি চার লাখ ৫৫ হাজার ৮৬৭ টাকার দুই হাজার ৪৩ শতক কৃষিজমি, নাসিরনগর, পূর্বচল ও রূপগঞ্জে ১১ কোটি ৭ লাখ ৮৭ হাজার ৭১ টাকার ৭৫৮ শতক অকৃষি জমি, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে ৩৬২ শতক জায়গায় ৪৬ কোটি ২১ লাখ ৮৮ হাজার ৪৮০ টাকা মূল্যের ভবন, উত্তরায় ৮ দশমিক ১৫ শতক জায়গায় ১০ কোটি ২ লাখ ২৩ হাজার ৫০৩ টাকা মূল্যের বাড়ি আছে।
স্ত্রীর স্থাবর সম্পদ আছে মোট দুই কোটি ৩৩ লাখ সাত হাজার ৮৫০ টাকার। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরখানে ২০ লাখ ৮৬ হাজার ৫৬০ টাকা মূল্যের ৫৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ জমি, বনানীতে এক কোটি ৮৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকার ১০ দশমিক ০৭ কাঠা জমিসহ বাড়ি এবং উত্তরায় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দুই হাজার ২০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটসহ ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ২৯০ টাকা মূল্যের দুই হাজার ৪৪৯ বর্গফুটের আরেকটি ফ্ল্যাট।
গত নির্বাচনের সময় একরামুজ্জামানের স্থাবর সম্পদ ১০৭ কোটি ৩৬ লাখ ৪২ হাজার টাকার এবং স্ত্রীর নামে ছিল দুই কোটি ৮ লাখ টাকার। ২০১৮ সালের নির্বাচনে একরামুজ্জামানের স্থাবর সম্পদ ছিল প্রায় ৭২ কোটি ৩০ লাখ টাকার ৬৮ হাজার ৪১ এবং স্ত্রীর নামে ছিল এক কোটি ৮৭ লাখ টাকার।
বর্তমানে তার নামে ২২৯ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬০২ টাকা, স্ত্রীর নামে দুই কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং দুই সন্তানের নামে দুই কোটি ৫৩ লাখ ছয় হাজার ৪৬২ টাকার দায় থাকার তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করেন তিনি। গত নির্বাচনে নিজ নামে ছিল প্রায় ২৩৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং ২০১৮ সালে ছিল প্রায় ২১৪ কোটি ৫ লাখ টাকা।
সাত বছরের ব্যবধানে একরামুজ্জামানের ঋণ বেড়েছে প্রায় ২২ গুণ। বর্তমানে নির্ভরশীল ব্যক্তিসহ ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য ৩৫টি ব্যাংক, সাতটি প্রতিষ্ঠান ও দুইজন ব্যক্তির কাছ থেকে ২ হাজার ৯৩৪ কোটি ৯৯ লাখ ৫৩ হাজার ৪৩৪ টাকা ঋণ নিয়েছেন। গত নির্বাচনে ২০টি ব্যাংকসহ মোট ২২টি প্রতিষ্ঠান থেকে ২ হাজার ৩০১ কোটি টাকা এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে ১৩৩ কোটি ৭০ লাখ ৬ হাজার ১০৮ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। একরামুজ্জামান নির্বাচনে নিজের ব্যবসা থেকে ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করবেন বলে হলফনামায় বলেছেন।
মামলার বিবরণ
হলফনামা অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের একরামুজ্জামানের বিরুদ্ধে ঢাকার যাত্রাবাড়ি থানায় একটি, উত্তরা পূর্ব থানায় দুটি, উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর থানায় একটি ও সদর থানায় দুটি মামলা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে এসব মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন করেছেন হলফনামায় বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০০৯, ২০১৯, ২০২২ ও ২০২৩ সালে ঢাকায় হওয়া পাঁচটি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি মামলা থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন।ে