বাংলার প্রতিচ্ছবি: ডোনাল্ড ট্রাম্পের তথাকথিত অর্থনৈতিক শান্তি কৌশল মূলত নয়া উদারবাদী সম্প্রসারণবাদী রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ। এবং এসব কৌশল বিশেষত ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে রাজনৈতিক সংকটগুলোর সমাধানে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। লন্ডনের রয়্যাল হলোওয়ে ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক অর্থনীতি বিষয়ের পিএইচডি গবেষক এবং আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক সামির বি জাবের। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরায় তার লিখিত এক প্রবন্ধে এ বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
২৭ জানুয়ারি প্রকাশিত এই নিবন্ধে বলা হয়, গত এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসন গাজা, ইউক্রেন এবং ইসরায়েল-সিরিয়া প্রেক্ষাপটে শান্তি প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে অর্থনৈতিক প্রণোদনার ওপর জোর দিয়েছে। এটিকে নতুন ধারণা হিসেবে তুলে ধরা হলেও, বাস্তবে এটি পশ্চিমা নয়া উদারবাদী চিন্তার পুরোনো ধারা, যেখানে রাজনৈতিক সমাধানের বদলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। অধিকৃত ফিলিস্তিনের অভিজ্ঞতাসহ সমস্ত প্রেক্ষাপটেই এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
১৯৯০ এর দশকের তথাকথিত শান্তি প্রক্রিয়ার সময় ইসরায়েল অর্থনৈতিক শান্তি ধারণা সামনে আনে। তখন ফিলিস্তিনিদের কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দখলদারত্ব অব্যাহত থাকে, সেটেলারদের অবকাঠামো সম্প্রসারণ বাড়ে এবং অসন্তোষ জমতে থাকে। এর ফল হিসেবে নতুন করে গণআন্দোলন শুরু হয়। ২০০৭ সালের পরও আন্তর্জাতিক নানা উদ্যোগে একই ধরনের নীতি ফিরে আসে, যেখানে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণের মূল প্রশ্ন এড়িয়ে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে মূলত সুবিধা পেয়েছে একটি ছোট গোষ্ঠী, সাধারণ ফিলিস্তিনিরা থেকে গেছে সংকটে।
সামির বি জাবেরের মতে, এসব নীতির ফলে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পথ সুগম হওয়ার বদলে ফিলিস্তিনিদের মুক্তির সংগ্রামকে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার সুযোগ পেয়েছে।
গাজার জন্য সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও একই ধারা অনুসরণ করছে। এতে বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার উপেক্ষিত থাকছে। নিরাপত্তা প্রশ্নটি দখলদার শক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী উপস্থাপন করা হচ্ছে, ফলে ফিলিস্তিনিদের একটি নজরদারির আওতাধীন শ্রমশক্তিতে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
একই ধরনের মডেল এখন গোলান মালভূমি ও ইউক্রেনের দোনবাস অঞ্চলেও প্রস্তাব করা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে শক্ত রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়াই অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের কথা বলা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও অস্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদি অবিচারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সামির বি জাবেরের মতে, কেবল বাজার বা বিনিয়োগ দিয়ে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। একটি জাতি শুধু শ্রমিক বা ভোক্তাদের সমষ্টি নয়। তারা ইতিহাস, জাতিগত পরিচয় ও রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে গঠিত একটি সমাজ। সার্বভৌমত্ব, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক আইনের মতো মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্নের সমাধান না হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই শান্তি আনতে পারবে না। এই ভিত্তি ছাড়া অর্থনৈতিক শান্তি পরিকল্পনা বারবার ব্যর্থই হতে থাকবে।