বাংলার প্রতিচ্ছবি: হঠাৎ করে সরবরাহ ঘাটতিতে বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)–এর দামে যেনআগুন লেগেছে। অথচ পরিস্থিতি সামাল দিতে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কার্যত হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। এমনকি কমিশনের চেয়ারম্যানও স্বীকার করেছেন, এককভাবে বিইআরসির পক্ষে এই সংকট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দেয় বিইআরসি। কিন্তু বাস্তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতিটি ১২ কেজির সিলিন্ডার ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হওয়াই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ সংকটে সেই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত। আবার কোথাও কোথাও এলপিজি মিলছেই না। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন গ্রাহকরা।
গত সপ্তাহের শেষ দিকে হঠাৎ করেই বাজারে এলপিজির ঘাটতি দেখা দেয়। গত বুধবারও ১২ কেজির এক সিলিন্ডার এলপিজি নির্ধারিত ১২০০ টাকার বদলে ১৬০০ টাকায় বিক্রি হয়। গ্রাহকরা এটিকে প্রায় ‘স্বাভাবিক’ বলেই মেনে নিচ্ছেন। কারণ, বিইআরসি ডিসেম্বর মাসে ১২ কেজির এলপিজির দাম ১২০০ টাকা নির্ধারণ করলেও ওই মাসে কোথাও ১৫৫০ টাকার নিচে এলপিজি পাওয়া যায়নি।
সে হিসাবে বুধবার প্রতি সিলিন্ডারে প্রচলিত দামের চেয়ে ৫০ টাকা বাড়ে। তবে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। গত দুই দিনে খুচরা বাজারে ১৮০০ টাকার নিচে এলপিজি কিনতে পারেননি কেউ। কোনো কোনো দোকানে দাম হাঁকা হয়েছে ২২০০ টাকা পর্যন্ত।
প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের দরের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত হলেও এলপিজির খুচরা বাজার চলে পুরোপুরি নিজস্ব নিয়মে।
জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করে জ্বালানি বিভাগ, আর এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। তবে জ্বালানি তেল বাজারজাত করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা। বিপরীতে এলপিজির বাজার প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দখলে।
সরকার ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে যে পরিমাণ এলপিজি বাজারজাত করে, তা মূলত জেলা পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি এলপিজির সরবরাহ বাড়ানো গেলে বাজারে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতো। সেক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা ইচ্ছেমতো দাম বাড়াতে পারতেন না।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সাধারণত ওমান, কাতার, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এলপিজি আমদানি করে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এলপিজি পরিবহনকারী কয়েকটি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় পরিবহন সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে কিছু কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারছে না, যা বাজারে ঘাটতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকট স্বল্পমেয়াদি নাকি দীর্ঘমেয়াদি—তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ আগেও ছিল। তবে তখন পার্থক্য এতটা বেশি ছিল না। এবারের দাম বৃদ্ধি অস্বাভাবিক।’ তিনি জানান, এলপিজি অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কম থাকায় এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি জাহাজ সংকটও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে অভিযান চলছে। শুক্রবারও ভোক্তা অধিকার অভিযান পরিচালনা করেছে।’ তবে বিষয়টি এককভাবে বিইআরসির পক্ষে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা প্রয়োজন। সমস্যা সমাধানে সন্ধ্যায় বিইআরসির সঙ্গে বৈঠক করবেন জ্বালানি উপদেষ্টা।
এলপিজি বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক সমিতি লোয়াবের সহসভাপতি হুমায়ুন রশিদ বলেন, ‘আমাদের মূল সমস্যা দুটি—একদিকে সোর্স থেকে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে জাহাজও মিলছে না।’ তিনি জানান, বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আনার পাশাপাশি জাহাজ খোঁজার চেষ্টা চলছে। তাঁর আশা, চলতি মাসের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।