
বাংলার প্রতিচ্ছবি: যুদ্ধ, সংঘাত আর জলবায়ু পরিবর্তনের কপালে ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্য দেশে পাড়ি জমানো কোটি কোটি মানুষের জন্য জীবন বাঁচানোই এক বিরাট লড়াই। কিন্তু সেই লড়াইয়ে আশ্রয় দেওয়া সংস্থাগুলোর পকেটেও টান পড়েছে চরমভাবে। তহবিলের অভাবে একদিকে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে চিকিৎসাসেবা, নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও শিশুদের সুরক্ষার ব্যবস্থা; অন্যদিকে আটকের ভয়ে তটস্থ থাকতে হচ্ছে হাজার হাজার শরণার্থীকে। দাতাদেশগুলোর সহায়তার রাশ টেনে ধরা আন্তর্জাতিক এই মানবিক সংকটকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর সাম্প্রতিক তথ্যে উঠে এসেছে বিশ্বজুড়ে ত্বরান্বিত হওয়া এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের চিত্র। অর্থায়নের তীব্র ঘাটতির কারণে চাদ, ইথিওপিয়া, সুদান, সিরিয়া ও আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত লাখ লাখ শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষ মৌলিক মানবাধিকার ও জীবনরক্ষাকারী সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।
নিবন্ধন জটিলতা ও সুরক্ষাহীনতায় লাখ লাখ মানুষ
তহবিল-সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়েছে আফ্রিকার দেশ চাদে। দেশটিতে বর্তমানে ৩ লাখ ১৯ হাজার শরণার্থী নিবন্ধন প্রক্রিয়া না হওয়ায় প্রয়োজনীয় আইনি নথিপত্র ও সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা তাঁদের যেকোনো সময় গ্রেফতার ও আটকের ঝুঁকিতে ফেলছে। শুধু তা-ই নয়, চাদে প্রায় ২ লাখ নারী ও কন্যাশিশু তাঁদের নিরাপদ আশ্রয় এবং সহিংসতা প্রতিরোধ কর্মসূচি হারানোর মুখে রয়েছেন। অন্যদিকে, প্রায় ২ লাখ ৩৩ হাজার শিশু হারাতে পারে জরুরি শিশুসুরক্ষা সেবা।
ইথিওপিয়াতে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের নিরাপদ আশ্রয়ের সক্ষমতা মাত্র এক বছরে অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত সুদানে হাজার হাজার যৌন সহিংসতার শিকার শিশু ও নারী জীবনরক্ষাকারী সেবা হারানো থেকে সামান্য দূরত্বে রয়েছে। জীবনজীবিকা অর্জনের দিক থেকেও পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক; চাদে ৩ লাখ ৯৫ হাজার এবং ইরাকে ৩ লাখ ৫০ হাজার শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী অর্থনৈতিক সুযোগ ও কর্মসংস্থান হারানের চরম ঝুঁকিতে আছেন।
আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় স্বদেশ প্রত্যাবর্তন স্তব্ধ
বাস্তুচ্যুত মানুষকে নিজ দেশে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার কাজও অর্থসংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে। সিরিয়ায় জরুরি তহবিল না পৌঁছালে ১ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ জন চরম অসহায় অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষ ও দেশে ফেরা শরণার্থী প্রাথমিক কোনো আর্থিক সহায়তা ছাড়াই অনিশ্চয়তায় পড়বেন।
একই দৃশ্য দেখা গেছে আফগানিস্তানেও। ২০২৪ সালে যেখানে ৫ হাজার ৩০০টি পরিবার পুনর্বাসন অনুদান পেয়েছিল, ২০২৬ সালে সেই অনুদান নেমে এসেছে মাত্র ১৭৫টি পরিবারে।
নমনীয় অর্থায়নের ঘাটতি
একদিকে যেমন অর্থায়ন কমেছে, অন্যদিকে সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দাতা দেশগুলোর নমনীয়তা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। সংগৃহীত তহবিলের অর্থ নির্দিষ্ট কোনো কার্যক্রম বা প্রকল্পের জন্য বেঁধে দেওয়ার (Earmarked Fund) হার ২০২২ সালের ১৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৫১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে ইউএনএইচসিআর চাইলেও জরুরি ভিত্তিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন থাকা ক্ষেত্রে সেই অর্থ খরচ করতে পারছে না।
ইউএনএইচসিআর-এর জরুরি আহ্বান
এই বিশ্বব্যাপী মানবিক বিপর্যয় ঠেকাত জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা জরুরি ভিত্তিতে বিশ্বসম্প্রদায়, দাতা সংস্থা ও অংশীদারদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে। অর্জিত মানবিক সাফল্যগুলো রক্ষা করা, শরণার্থীদের শুধু ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল না রেখে স্বাবলম্বী করে তোলা এবং তাঁদের নতুন করে জীবন গড়ার সুযোগ করে দিতে শর্তহীন ও ‘নমনীয় অর্থায়ন’ (Flexible Funding) বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।