
বাংলার প্রতিচ্ছবি: রাজধানীতে মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে গত ১০ বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করলেও মশার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাননি নগরবাসী। বছরজুড়েই কিউলেক্স ও এডিস মশার কামড়ে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। চলতি বছরের ৩ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৪৫৮ জন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন। জুলাই ও আগস্ট মাসে এই প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বরাদ্দের হিসাব ও ব্যয়ের খাত: গত এক দশকে মশক নিধনে দুই সিটির বাজেট বরাদ্দ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটিতে বরাদ্দ ছিল ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় আট গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকায়। গত ১০ বছরে উত্তর সিটি এ খাতে মোট ৭২৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে একই সময়ে বরাদ্দ ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা থেকে ৪.৭ গুণ বেড়ে হয়েছে ৫৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা; গত এক দশকে তাদের মোট বরাদ্দ ছিল ৩১০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এই বিপুল অর্থ মশক নিধনের ওষুধ, যন্ত্রপাতি ক্রয়, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং প্রচারণায় ব্যয় হয় বলে জানিয়েছেন দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম।
ব্যর্থতার কারণ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: কোটি কোটি টাকা খরচের পরও কেন মশা কমছে না—এই প্রশ্নে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী জানান, ২০১৯ সালের পর এডিস মশা শুধু বর্ষাকালে সীমাবদ্ধ না থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন পর্যন্ত রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত একযোগে সমন্বিত কোনো মশক নিধন কর্মসূচি নেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, কার্যকর ওষুধ নির্বাচন করে বছরে অন্তত দুইবার দেশজুড়ে একযোগে মশার প্রজননস্থল পরিষ্কার ও লার্ভা নিধন অভিযান চালানো দরকার। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত ডেঙ্গুর টিকা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি।
সরকারের প্রস্তুতি ও উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স: ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ‘এনএস১’ (NS1) পরীক্ষার কিট সরবরাহ করা হয়েছে এবং হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জনগণের সচেতনতার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন। ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে প্রধান করে ১৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের ‘টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে বিশেষ অভিযান ও জরিমানা: টাস্কফোর্স গঠনের পর রাজধানীজুড়ে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। সম্প্রতি জিগাতলা এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনে এডিসের লার্ভা পাওয়ায় দুই মালিককে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং দক্ষিণ সিটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টাস্কফোর্সের নির্দেশনায় বিশেষ অভিযান ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম গতিশীল করা হয়েছে। তবে লার্ভা ধ্বংস ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নগরবাসীকে নিজ নিজ বাড়িঘর পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে এই লড়াইয়ে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।