
বাংলার প্রতিচ্ছবি: হবিগঞ্জের দিগন্তজোড়া হাওর এখন অথৈ জলরাশি। তবে এই পানি কৃষকের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপ হয়ে এসেছে। কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে শত শত হেক্টর জমির আধাপাকা ও পাকা বোরো ধান। শেষ মুহূর্তের এই আকস্মিক বিপর্যয়ে জেলার ৯টি উপজেলার হাজার হাজার কৃষক পরিবার এখন দিশেহারা। ঋণের বোঝা আর আগামী দিনের অন্নের চিন্তায় হাওরপাড়ের ঘরে ঘরে চলছে কান্নার রোল।

হাওরপাড়ের গ্রাম তাড়ানগাঁও। এই গ্রামের কৃষাণী সন্ধ্যা রানী দাশের বুকফাটা আর্তনাদ যেন আজ পুরো জেলার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরই প্রতিধ্বনি। ১০ কিয়ার জমিতে পরম মমতায় ফলিয়েছিলেন সোনালি ফসল। দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন এই আশায় যে, ফসল ঘরে তুলে ঋণ শোধ করবেন এবং ১০ জনের সংসারে সচ্ছলতা ফিরবে। কিন্তু চোখের সামনেই সব স্বপ্ন তলিয়ে গেল ঘোলা জলে।
অশ্রুসিক্ত চোখে সন্ধ্যা রানী বলেন, "সব শেষ হয়ে গেল। দুই ছেলেকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছিলাম। এখন ঋণের টাকা দেব কীভাবে আর পরিবারের মুখে অন্নই বা দেব কীভাবে?"
সরেজমিনে হাওর এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। কোথাও বুক সমান পানিতে নেমে কৃষকরা কাঁচা ধান কাটার চেষ্টা করছেন, আবার কোথাও কাটা ধান বৃষ্টির কারণে মাড়াই করতে না পেরে পচে নষ্ট হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার ৫৩৭ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৬২৩ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হয়েছে এবং ৫ হাজার ৯১৫ হেক্টর জমি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। সরকারি হিসেবেই সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন অন্তত ১৯ হাজার ৬৩০ জন কৃষক। তবে মাঠপর্যায়ে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। তাদের দাবি, সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত তিন মাসের বিশেষ সহায়তা যেন কালক্ষেপণ না করে দ্রুত তাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে স্বচ্ছতার সাথে ত্রাণ ও কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি চালুর জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। কৃষকরা বলছেন, দ্রুত সহায়তা না পেলে হাওর এলাকায় তীব্র মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে।
বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রশাসনের তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক কৃষিবিদ দ্বীপক কুমার পাল। তিনি বলেন, "জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ যৌথভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ করছে। আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সরাসরি মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। তালিকা চূড়ান্ত হওয়ামাত্রই তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে এবং সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।"
হাওরের কৃষক প্রতিবছরই প্রকৃতির বৈরিতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকে। কিন্তু এবারের আঘাত যেন তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। সোনার ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া এই মেহনতি মানুষগুলো এখন তাকিয়ে আছেন শুধু সরকারি সাহায্যের দিকে— যাতে ঋণের বোঝা কাটিয়ে তারা আবারও নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস সঞ্চয় করতে পারেন।