ঢাকা | ৩১ অগাস্ট ২০২৫ ইং | বঙ্গাব্দ

মোরেলগঞ্জে পানগুছির করাল গ্রাস: নির্ঘুম শত শত পরিবার, হারিয়ে যাচ্ছে ভিটেমাটি ও আশা

প্রকাশের তারিখ: Jul ২৬, ২০২৫ ইং

ছবির ক্যাপশন:
ad728
প্রতিদিনের বাংলার প্রতিচ্ছবি :

প্রিন্স মণ্ডল অলিফ (বাগেরহাট) 
“রাতে ঘুমাই না। কখন যে পানি এসে ঘরটাও নিয়ে যাবে, জানি না। একটা বেড়িবাঁধ হবে শুনছি সেই কবে থেকে। এখনও শুধু স্বপ্ন…”
এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার গাবতলা গ্রামের দিনমজুর জসিম বিশ্বাসের স্ত্রী নূরুন নাহার বেগম। যাঁর চোখে-মুখে শুধুই শঙ্কা, হাহাকার আর অতীত হারানোর বেদনা।

পানগুছি নদীর লাগাতার ভাঙন যেন থামতেই চায় না। বছরের পর বছর ধরে মোরেলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের গাবতলা ও কাঠালতলা গ্রামের মানুষ এ ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে রীতিমতো জীবনযুদ্ধে লড়ছেন। এই দুই গ্রামের প্রায় এক হাজার পরিবার ইতোমধ্যে নদীর গর্ভে বিলীন হওয়া তিন হাজার বিঘারও বেশি ফসলি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে স্থানান্তরিত হয়েছেন খুলনা, চট্টগ্রাম বা ঢাকায়।

আরও পড়ুন:


ভাঙনের গিলে খাওয়া জীবন 
গাবতলা গ্রামের নূরুন নাহার বেগম বলেন, “স্বামীর ৫-৭ বিঘা জমি, ভিটেমাটি সবই নদীতে গেছে। তিন বছর ধরে মস্তিষ্কের রোগে ভুগছেন উনি। রাস্তার পাশে একটা টিনের চালা তুলে কোনও রকমে থাকি। পাঁচ সন্তান নিয়ে ঘুম আসে না—রাত জেগে শুধু ভাবি, কাল আবার কি থাকবে?”

এই গ্রামের খালেক বিশ্বাস, আশ্রাব আলী শেখ, শহিদ বেপারী, হারুন হাওলাদারসহ অনেকেই জানালেন—তাদের পুরো জীবনটাই এখন শুধুই অনিশ্চয়তায় ঘেরা। “এ নদী সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। যে বাড়িতে জন্মেছিলাম, সেই জায়গার চিহ্নও নেই। শুধু শুনি বেড়িবাঁধ হবে... হয় না।”



স্কুল-মসজিদও নিরাপদ নয়
নদীর তীর ঘেঁষে থাকা ১১৬ নং গাবতলা ইসলামাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাইতুন আমিন জামে মসজিদ, স্থানীয় মাদ্রাসা ও এতিমখানা এখন সরাসরি ভাঙনের হুমকিতে। স্কুলের সহকারী শিক্ষক আব্দুল কাইয়ুম, শাহিনুর খানম ও দোলা রায় জানান, “প্রায় প্রতি মাসেই ১০-১২ দিন হাঁটু পানি ভরে যায় স্কুল মাঠে। জাতীয় সংগীত, শরীরচর্চা কিছুই করা যায় না। শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে থাকে, শিক্ষকরা থাকেন উদ্বিগ্ন।”

এমন পরিবেশে শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারও ব্যাহত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়নে ধীরগতি
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হান মোহাম্মদ আল বিরুনী বলেন,
“পানগুছি নদীর ভাঙনরোধে মোরেলগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর আওতায় খাউলিয়া থেকে ফেরিঘাট পর্যন্ত সাড়ে ৪ কিলোমিটার এবং শ্রেণীখালী এলাকায় দেড় কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ চলমান। ভাঙনরোধে আপাতত জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। ভবিষ্যতে ব্লকও ফেলা হবে।”

তিনি আরও জানান, প্রকল্পের কাজ ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবতার প্রেক্ষিতে সময় আরও বাড়তে পারে।

ভাঙনের চেয়ে ভয়ানক অপেক্ষা
স্থানীয়দের মতে, ভাঙনের চেয়ে বড় যন্ত্রণা হলো বছরের পর বছর ধরে "বেড়িবাঁধ হবে"—এই আশ্বাস শুনে যাওয়া। চোখের সামনে যখন ফসলি জমি নদীতে হারিয়ে যায়, সন্তানদের স্কুলে পাঠানো অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন মানুষের চাওয়া থাকে খুবই মৌলিক—একটা নিরাপদ মাথা গোঁজার ঠাঁই।

নূরুন নাহার বেগমের মতো শত শত মায়ের একটাই চাওয়া— “এই জীবনে অন্তত একটা দিন যেন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি। স্বপ্ন নয়—বেড়িবাঁধটা হোক। আমরা বাঁচি।”

কমেন্ট বক্স